টাইমস বাংলা নিউজ ডেস্ক:

বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে ‘স্বাধীনতার ঘোষণা নেই’ দাবি করা বিএনপির নেতাদের তীব্র সমালোচনা করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বলেছেন, পাকিস্তানি সামরিক জান্তার পদলেহনকারী ও তোষামদকারীরা ওই ভাষণে স্বাধীনতার ডাক পাবে না।

ঐতিহাসিক ৭ মার্চ উপলক্ষে রাজধানীর দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত আওয়ামী লীগের আলোচনায় গণভবন প্রান্ত থেকে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়ে সভাপতির বক্তব্যে এ কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর গত ৪৩ বছরে এবারই প্রথম ৭ মার্চের ঐতিহাসিক দিবসটি পালন করে বিএনপি। রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবে আলোচনা সভার আয়োজন করে দলটির স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন কমিটি।

সেখানে বিএনপির শীর্ষ নেতারা তাদের বক্তব্যে বঙ্গবন্ধুর এ ভাষণের ঐতিহাসিক গুরুত্ব স্বীকার করলেও এটির উদ্দেশ্য নিয়ে সমালোচনা করেন। তারা বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে ‘দরকষাকষির জন্য’ ভাষণ দিয়েছিলেন।

দলটির নেতারা আরও বলেন, ৭ মার্চের ভাষণ স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল না। তখনকার ছাত্র সমাজ ৭ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণার জন্য যে প্রত্যাশা করেছিল, সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি সে ভাষণে। ভাষণটি নিয়ে আওয়ামী লীগ ইতিহাস বিকৃতি করছে বলেও অভিযোগ করেন বিএনপি নেতাদের।

৭ মার্চ নিয়ে বিএনপির এসব নেতাদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি শুনলাম বিএনপির কয়েকজন নেতা এদের মধ্যে কয়েকজন আছে যারা এক সময় ছাত্রলীগ করেছিল, পরে যারা ছেড়ে চলে গিয়েছিল। তারা নাকি এই ভাষণে স্বাধীনতার কোনো ঘোষণা পায়নি।

‘এরা পাবে না। কারণ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীও পায়নি, অনেক খুঁজেছে। আমার মনে হচ্ছে, এরা যেন সেই সামরিক জান্তাদের পদলেহনকারী, তোষামোদের দল। ফলে বাঙালি যা বুঝে তারা সেটা বোঝে না।’

বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, ‘আজকে বিএনপি নেতার কয়েকজনের বক্তব্য আর ওইদিনের কয়েকজনের কথা শুনে আমার শুধু মনে হচ্ছে তারা আসলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দালালি নিয়েই ছিল। এখনও তারা সেই দালালি ভুলতে পারেনি। এখনও তোষামোদি, চাটুকারিতা ভুলতে পারে নাই। সেজন্য তারা এখনও কিন্তু খোঁজে।

‘এই ভাষণে নাকি তারা স্বাধীনতা ঘোষণা কোনো মেসেজই খুঁজে পায়নি। অথচ যারা সেদিন প্রস্তুতি নিয়েছে, তৈরি হয়েছে, তারা কিন্তু ঠিকই বুঝেছে।’

‘২৫, ২৬ মার্চ হত্যাকাণ্ড চালায় জিয়া’

প্রধানমন্ত্রীর তার বক্তব্যে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানেরও কড়া সমালোচনা করেন। জানান, ২৫ মার্চ পাকিস্তান হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর হামলা করে। জাতির পিতা বলেছিলেন, ‘যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুতি নাও। রাস্তাঘাট যা কিছু আছে সব বন্ধ করে দাও।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘সেদিন যারা রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড দিচ্ছিল।…সেদিন যারা রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড দিচ্ছিল, বিশেষ করে চট্টগ্রামে যারা ব্যারিকেড দিচ্ছিল ২৫ মার্চ, তাদের ওপর যারা গুলি চালিয়েছিল, তাদের মধ্যে জিয়াউর রহমান একজন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন অফিসার হিসেবে এই বাঙালি যারা সংগ্রাম পরিষদ গড়েছিল, তাদের যারা রাস্তায় ব্যারিকেড দিচ্ছিল এই জিয়াউর রহমান গুলি করে হত্যা করে অনেককেই। চট্টগ্রামের মুক্তিযোদ্ধাদের জিজ্ঞেস করলেই তথ্য পাওয়া যাবে।

‘চট্টগ্রামের মুক্তিযোদ্ধাদের জিজ্ঞেস করলেই তথ্য পাওয়া যাবে। দেশেও অনেক আছে বিদেশেও অনেক আছে। শুধু তাই নয়, জিয়াউর রহমান ২৫, ২৬ এই দুদিনই হত্যাকাণ্ড চালায়।’

জিয়া প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘২৭ তারিখ সে (জিয়া) যাচ্ছিল সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র নামাতে। সে অস্ত্র যেন সোয়াত জাহাজ থেকে না নামায় সেজন্য আমাদের সংগ্রাম পরিষদের যারা, তারা বাধা দিয়েছিল। ছাত্ররা, সাধারণ জনগণ বাধা দিয়েছিল। সেখানে জিয়াউর রহমানকে তারা আটকায়। তাকে আটকেছিল যাতে সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র নামাতে না পারে। এটা ঠিক ২৬ তারিখ রাতের কথা।’

‘জাতির পিতার হত্যাকারীরা ৭ মার্চ বুঝবে না’

৭ মার্চের ভাষণের তাৎপর্য জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারীদের না বোঝাটা স্বাভাবিক বলে মন্তব্য করেন আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, ‘জাতির পিতাকে হত্যা করে সংবিধান লঙ্ঘন করে অবৈধ ক্ষমতাদখলকারী হিসেবে নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে ক্ষমতায় বসে দল গঠন করেছে, সেই দলের নেতারা ৭ মার্চের ভাষণের ভাষা বুঝবে না, এটা খুব স্বাভাবিক। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

‘এটা নিয়ে আলোচনা করারও কিছু নেই। ধরে নিতে হবে, এরা এখনও পুরনো প্রভুদের ভুলতে পারেনি। তাদের পালিত সারমেয় দল হিসেবে তারা আছে। এটাই বাস্তবতা। ফলে তারা কিছু বুঝবেন না।’

একাত্তরে স্বাধীনতার ঘোষণা

বক্তব্যে স্বাধীনতার ঘোষণা এবং সে সময়ের প্রেক্ষাপটও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ‘এককভাবে স্বাধীনতার যদি ঘোষণা দেয়, সে ঘোষণা অনেক সময় ব্যর্থ হয়। এটা অনেক দেশে হয়েছে। অতীত ইতিহাস আছে। কাজেই আমাদের এই সংগ্রামটা যেন কোনোমতে ব্যর্থ না হয়, আমাদের স্বাধীনতা যেন অর্জিত হয় সেটাই ছিল তার (বঙ্গবন্ধু) লক্ষ্য। সেজন্য নিজের জীবনের যত ঝুঁকি তিনি নিয়েছিলেন।’

বঙ্গবন্ধু কন্যা জানান, জহুর আহমেদ চৌধুরীর পরামর্শে দলের বাইরে একজন সেনা কর্মকর্তাকে দিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় আওয়ামী লীগ নেতারা। তাদের যুক্তি ছিল, এর মধ্য দিয়ে একটা যুদ্ধ ভাব আসবে।

‘মেজর রফিককে প্রথম বলা হয়, আপনি আসেন ঘোষণাটা দিয়ে যান। আমি এখানে অ্যাম্বুশ করে বসে আছি। আমি যদি সরি, তবে পাকিস্তানিরা এটা দখল করে নেবে। জিয়াউর রহমান যেহেতু জনগণের কাছে ধরা ছিল, তাকেই ধরে নিয়ে আসা হয়। তাকে দিয়েই ঘোষণাটা পাঠ করতে বলা হয়। আর সেখান থেকেই তারা তাকে ঘোষক বলে প্রচার চালায়। আর ২৫ মার্চ ও ২৬ মার্চ রাতে যে মানুষ হত্যা করেছে সে কথাটা সবাই ভুলে যায়।

‘কারণ, সে (জিয়াউর রহমান) আগাগোড়া পাকিস্তানের দালালি করে এসেছে। তার জন্মই তো ওখানে। তার লেখাপড়াও পাকিস্তানে। সে কবে বাংলাদেশের হলো? চাকরি সূত্রে এখানে এসেছিল। সেই সূত্রে বিয়ে করে পরবর্তীতে থেকে যায়। এটাই তো বাস্তবতা।’