নিজস্ব প্রতিনিধি <>

স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে যাওয়ার জন্য জাতিসংঘের চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েছে বাংলাদেশ সম্প্রতি। নিউইয়র্কে ইউনাইটেড নেশনস কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি বা ইউএন-সিডিপির পাঁচদিনের ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনা সভার পরে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে।
১৯৭১ সালে জাতিসংঘ নির্দিষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছিল। উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়ার জন্য বাংলাদেশ ২০১৬ সালে ইউএন-সিডিপির সকল শর্তপূরণ করেছে। কোনো দেশ যদি জাতিসংঘের নিয়ম অনুসারে পর পর দু’টি ত্রিবার্ষিক সভার পর্যালোচনাতে যদি কোনো দেশ ক্রসিংয়ের মানদণ্ডগুলো পূরণ করতে পারে তবে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে স্থানান্তরের জন্য চূড়ান্ত সুপারিশ পায়।
সিডিপির তিনটি সূচকের ভিত্তিতে এলডিসি থেকে স্থানান্তর পর্যালোচনা করে। তিনটি নির্দেশিকাতেই শর্তপূরণে বাংলাদেশ দীর্ঘ পথ এগিয়েছে। একটি উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হতে, একটি দেশের মাথাপিছু আয় কমপক্ষে ১২৩০ মার্কিন ডলার হতে হবে। ২০২০ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল ১৭২৬ ডলার।
হিউম্যান রিসোর্স সূচকের বিপরীতে বাংলাদেশের অর্জন ৮.৫। অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সুস্বাস্থ্যের সূচকটি পাস করার মানদণ্ডটি ৩২ বা তার চেয়ে কম নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে সেই সময়ে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ২৭।
সিডিপির বিধি মোতাবেক, কোনো দেশ পাশের সুপারিশ পাবার পরে তিন থেকে পাঁচ বছরের প্রস্তুতির সময় উপভোগ করতে পারে। বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলটি কোভিড-১৯ মহামারির জন্য রূপান্তর প্রক্রিয়াটি টেকসই এবং মসৃণ করতে প্রস্তুত করার জন্য পাঁচ বছরের জন্য সময় চেয়েছে।
সবকিছু ঠিক থাকলে, পাঁচ বছরের প্রস্তুতি শেষে, বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশে আনুষ্ঠানিক রূপান্তরটি হবে ২০২৬ সালে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, উন্নয়নশীল দেশে যাওয়ার পরে বাংলাদেশকে কিছু বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। কিছু নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ সাধারণ শর্তে ঋণ এবং বিভিন্ন রপ্তানিসুবিধা হারাবে। বিশ্ববাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশ এবং বিভিন্ন পণ্যের ওপর আমদানি শুল্ক-আরোপসহ আরও কয়েকটি সুযোগকে ধীরে ধীরে পরিত্যাগ করতে হবে। বেশ কয়েকটি সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে।
অপরদিকে, এর সুবিধাগুলো কাজের মাধ্যমে অর্জন করতে হবে। তারা মনে করে যে, এখন আমাদের দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্যচুক্তির দিকে মনোযোগ দিতে হবে। কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে পরিবর্তনের সুযোগ নিতে প্রস্তুত পোশাক শিল্পের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করে পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ এবং অর্থনীতির সামগ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে জোর দিয়েছেন।
অপরদিকে, বাংলাদেশ বাইরের বাজারের সুবিধা ধরে রাখতে সক্ষম হবে কি না; তৈরি পোশাক রপ্তানি নিয়ে যদি কোনো উদ্বেগ থাকে, তবে কী করা উচিত তা চিন্তা করা দরকার।
মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ওপর এখন জোর দেয়া উচিত। দেশের অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, এক্সচেঞ্জ রেট ইস্যু, বন্দর-সংক্রান্ত সমস্যা, পরিবহন সমস্যাসহ সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাজারের প্রবেশাধিকার তৈরি করা উচিত। একই সময়ে, রপ্তানির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
আমরা আমাদের অর্থনীতি এবং সামগ্রিক উন্নয়নের দিকে একবার নজর দিতে পারি। ২০০৮-০৯ সালে গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্টের (জিডিপি) পরিমাণ ছিল মাত্র ১০৩.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৯-২০-এ এটি বেড়ে দাঁডিয়েছে ৩৩০.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
২০১৮-১৯ সালে ৪০.৫৪ বিলিয়ন ডলার। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ৮.৪৬ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে আজ ৪৪.০৩ বিলিয়নে দাঁড়িয়েছে।
২০০১ সালে, দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪৭.৯ শতাংশ এবং চরম দারিদ্র্যের হার ছিল ৩৪.৩ শতাংশ। ২০১৯ সালে, দারিদ্র্যের হার ২০.৫ শতাংশ এবং চরম দারিদ্র্যের হার ১০.৫ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০০৯-১০ সালে বিদ্যুতের ইনস্টলড ক্ষমতা ছিল পাঁচ হাজার ২৬১ মেগাওয়াট।
বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৪,৪২১ মেগাওয়াট করা হয়েছে, এ থেকে উপকৃত জনসংখ্যা ৪৮ থেকে ৯৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশ বিশ্বের ধানের তৃতীয় বৃহত্তম উৎপাদনকারী এবং মাছ, মাংস, ডিম এবং শাকসব্জিতে স্বাবলম্বী। অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলে মাছ উৎপাদনের বৃদ্ধির হারের তুলনায় বাংলাদেশ দ্বিতীয় এবং ইলিশ উৎপাদনকারী ১১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ প্রথম অবস্থানে রয়েছে। আজ ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর সুবিধা শহর থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে।
অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে। মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, কর্ণফুলী টানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মহেশখালী-মাতারবাড়ি সমন্বিত উনয়ন প্রকল্পসহ বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, দুই ডজনেরও বেশি হাই-টেক পার্ক এবং আইটি গ্রাম নির্মিত হচ্ছে।
পদ্মা সেতু এখন দৃশ্যমান, গত ডিসেম্বরে শেষ স্প্যানটি স্থাপন করা হয়েছে। পদ্মা সেতু থেকে বিশ্বব্যাংক বরাদ্দ বাতিল করলে আওয়ামী লীগ সরকার এটিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করে। সরকার তার তহবিল দিয়ে সেতুটি নির্মাণের উদ্যোগ নেয়।
বঙ্গবন্ধুকন্যা, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং বিশ্বনেতা শেখ হাসিনা বাঙালি জাতির অনুপ্রেরণার উৎস। বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগকে তৃণমূলের জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলে পরিণত করেছিলেন। জাতির পিতার নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর তার নির্বাসিত কন্যা শেখ হাসিনা সবচেয়ে খারাপ সময়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ করেছেন।
তিনি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অনেক এগিয়ে এসেছেন। তিনি বার বার মৃত্যুর দ্বার থেকে ফিরে এসেছেন। ১৯৯৬ সালে ২১ বছর পর আওয়ামী লীগকে জনপ্রিয় দল হিসেবে ক্ষমতায় এনেছেন।
১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা সরকার গঠন করে যে অসম্ভব কাজটি সম্ভব করেছিলেন তা হলো জাতির পিতা ও তার পরিবারের হত্যাকারীদের বিচার এবং পরে ২০১০ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওতায় নিয়ে এসেছেন।
আর বাঙালি জাতির আদর্শকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন নিরন্তর। তিনি বাংলাদেশের জনগণের সার্বিক কল্যাণ, বিকাশ এবং মুক্তির লক্ষ্যে অগ্রণী হিসেবে কাজ শুরু করেছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, বাংলাদেশে গণতন্ত্র বিকাশের জন্য তার বিকল্প নেই।
তার সততা, নিষ্ঠা, যুক্তিবাদী মানসিকতা, দৃঢ়তা, মনোবল, প্রজ্ঞা এবং অসাধারণ নেতৃত্ব বাংলাদেশকে বিশ্ব অঙ্গনে এক ভিন্ন উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।
আওয়ামী লীগ সবসময় শোষণ, বঞ্চনা, অবিচার, নিপীড়নের বিরুদ্ধে রাজনৈতিকভাবে সোচ্চার, প্রতিরক্ষামূলক ভূমিকা পালন করে আসছে। এই দল প্রতিষ্ঠার পর থেকে জনগণের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক মুক্তির জন্য কাজ করছে।
এই দল ক্ষমতায় থাকলে জনগণের ভাগ্যের উন্নতি হয়। দলের ৭২ বছরের ইতিহাস সেই সত্যের সাক্ষ্য দেয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৪টি মাইলফলক দিয়েছেন, প্রথমটি হলো ডিজিটাল বাংলাদেশের ভিশন ২০২১, দ্বিতীয়টি ২০৩০ সালে টেকসই উন্নয়ন অভিষ্ট (এসডিজি) অর্জন করা, তৃতীয়টি ২০৪১ সালে একটি উন্নত বাংলাদেশ গড়ার এবং চতুর্থটি ২১০০ সালের ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়ন।
ডিজিটাল বাংলাদেশের স্থপতি প্রধানমন্ত্রীর আইটি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অসামান্য অবদান রেখে চলেছেন।
শিক্ষায় উন্নতি, যোগাযোগের অবকাঠামো, নারীদের শিক্ষা, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা ১০০% বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বই বিতরণ, সামাজিকভাবে সুবিধাবঞ্চিত, অসহায়, বয়স্ক, বিধবা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সুরক্ষার সোশ্যাল সেফটি নেট সাপোর্ট প্রদান, স্বামী পরত্যক্তা নারীদের সহযোগিতা, অটিজম, প্রধানমন্ত্রীর সরকারের প্রধান উদ্যোগসমূহ বাংলাদেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের জাতীয় বীর হিসেবে মর্যাদা প্রদান, আশ্রয়ণ প্রকল্প, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প, নারীর ক্ষমতায়ন এবং বিভিন্ন সেক্টরের সামগ্রিক উন্নয়ন তার সরকারেরই অবদান। আমাদের একটি ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক এবং আধুনিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।
এটিই বর্তমান প্রজন্মের প্রত্যাশা।
লেখক:
হীরেন পণ্ডিত
প্রাবন্ধিক