বিশেষ প্রতিনিধি <>

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী : বঙ্গবন্ধু থেকে জননেত্রী আব্দুল লতিফের লেখা ‘দাম দিয়েছি কিনেছি বাংলা, কারো দানে পাওয়া নয়’ গানটা শুধু মার্চ মাসেই নয়, সারাবছরই আমি মনপ্রাণ দিয়ে শুনি এবং হৃদয়ে ধারণ করি। গানটির বিশেষ কয়েকটি লাইন আমি বারবার মনোযোগ দিয়ে শুনি, ‘দাম দিয়াছি মায়ের অশ্রু বোনের সম্ভ্রম রে/ওরে বলতে কি কেউ পারো রে ভাই/দাম কি কারও কম রে?/কত কুলের কুলাঙ্গনা নাম নিয়াছে বীরাঙ্গনা/দুঃখে বাংলার পদ্মা মেঘনা যমুনা যে উজান বয়/দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা’।

আজ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের ৫০ বছর পূর্তিতে ইতিহাসের মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি। আমি লেখার প্রথমেই বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা, ৩০ লাখ শহীদ এবং ২ লাখ সম্ভ্রম হারানো মা-বোনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। বাংলার যত বীরাঙ্গনা রয়েছেন তাদের প্রতিও শ্রদ্ধা। আজকের এই মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে দৃঢ়ভাবে বলতে পারি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম না হলে আজকে আমরা এই স্বাধীন বাংলাদেশ ও লাল সবুজের পতাকা পেতাম না।

পলাশীর আম্রকাননে সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মাধ্যমে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য যেখানে অস্তমিত হয়েছিল, সেখানে বঙ্গবন্ধুই আমাদের একত্রিত করে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন। তার নেতৃত্বেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। দীর্ঘ ২৩ বছরের শোষণ আর অবিচারের অনিবার্য পরিণতি ছিল সুমহান মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী বাংলাদেশ ৫০ বছরে এসেও আমরা পুরোপুরি দেখতে পাইনি। তবে আমাদের বিশ্বাসের জায়গায় আলো হাতে পথপ্রদর্শক হয়েছেন তাঁরই সুযোগ্য কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশবাসী বিশ্বাস করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কন্যার হাতেই বাংলাদেশ নিরাপদ। শেখ হাসিনার প্রজ্ঞা, ধী শক্তি এবং দূরদৃষ্টির সমন্বয়ে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে নতুন বিস্ময়। স্বল্পন্নোত দেশ থেকে আজ উন্নয়নশীল দেশ। বটমলেস বাস্কেট এখন সারা বিশ্বের অবাক বিস্ময়।

আমরা সৌভাগ্যবান মনে করি নিজেদেরকে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণের সাক্ষী হয়ে থাকতে পেরে। কিন্তু এখনো আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয় এই ভেবে, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার পথে যখন শেখ হাসিনা দিনরাত পরিশ্রম করে চলেছেন; তখন তারই পাশে এখনো বিশ্বাসঘাতক মোশতাকদের বসবাস রয়েছে। তারা এখনো মনেপ্রাণে পাকিস্তানের আদর্শকে লালন করে দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালো রাতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর এদেশে ইতিহাস বিকৃতির যে কালো অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল তা এখনও বহমান।

ষড়যন্ত্রকারীদের এই কাজটি এখনো অব্যাহত রয়েছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু এবং সুমহান মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে, এই মহলটি ইতিহাস বিকৃতির মাধ্যমে দেশবাসীকে চোরাগলিতে নিয়ে যেতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছিল। ইতিহাসের সরল গতিপথকে আটকে দিয়ে নিজেরা নিজেদের মত করে ইতিহাস রচনা করেছিল। তাবে আশার কথা, তরুণ প্রজন্মের সামনে শেখ হাসিনা নিজেই উদ্যোগী হয়ে মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধু সম্পর্কিত নানা গোপন তথ্য প্রকাশ করছেন। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল ঘটনা। তৎকালীন পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনগুলো তিনি বই আকারে প্রকাশ করার উদ্যোগ নিয়েছেন। যা বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা এমন সাহস দেখাতে পারেনি। এক্ষেত্রে আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

আজকের এই বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে যখন দেখি বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাস নামক বইয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে অবমাননা করা হয়, তখন নিজের বিবেকের তাড়নায় মহামান্য হাইকোর্টে রিট আবেদন করি। গত ২০১৮ সালের ২ অক্টোবর এই রিট আবেদনের চূড়ান্ত রায় দিয়েছেন মহামান্য হাইকোর্ট। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকে গভর্নরসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে সতর্ক করার পাশাপাশি এ ধরনের কাজে বাংলাদেশিদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে এবং এটি অমার্জনীয় অপরাধ। এই রিট আবেদন করার পর আমার ওপর নানামুখী চাপ আসলেও একটিবারের জন্যও আদর্শিক এ লড়াই থেকে পিছপা হইনি।

কারণ এ লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সাহস দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। জাপানে রাষ্ট্রীয় সফরে যাওয়ার সময় উড়ন্ত বিমানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে বলেছিলেন, ‘সবাই তো এ লড়াই করতে পারে না। তুমি এটা করেছো, লড়াই চালিয়ে যাও।’ এরপর থেকে আমি এ লড়াইয়ে অনেককে সাথে পেয়েছি, আবার অনেকেই সরেও গেছেন। আজ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর দিনে এসব ভুলে নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে আরো কিছু কথা বলতে চাই। আজ বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তীতে ৫০টি দেশে ডিজিটাল পদ্ধতিতে তা পালন করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের বিষয়।

এক সময় যারা আমাদের তলাবিহীন ঝুঁড়ি বলতো, তারাই এখন আমাদের উন্নয়নকে রোল মডেল হিসাবে গ্রহণ করছে। এসব কিছুই সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ়চেতা নেতৃত্ব এবং বলিষ্ঠ মনোবলের কারণে। তার মতো একজন প্রাজ্ঞ, বিচক্ষণ রাষ্ট্রনায়ক যতক্ষণ বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় রয়েছেন, ততক্ষণ বাংলাদেশ দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাবে।

ষড়যন্ত্রকারীরা আবারও পরাজিত হবে। এক্ষেত্রে শেখ হাসিনার হাতকে আরো শক্তিশালী করার জন্য অবশ্যই আমাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে নিজেদেরও দায়িত্বগুলো পালন করতে হবে। তাহলেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব বলে মনে করি। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর এই দিনে আমাদের সকলের প্রতিজ্ঞা হোক, শেখ হাসিনার হাতকে আরও শক্তিশালী করতে নিজেদের দায়িত্ববোধ থেকে দেশের মানুষের কল্যাণে নিজেদের নিয়োজিত করি।

জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

ড. কাজী এরতেজা হাসান  https://dailyvorerpata.com/details.php?id=59653