চলমান লকডাউনে প্রথম রোজা থেকে রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে রোগীর স্বজন, ছিন্নমূল ও অসহায় মানুষের মাঝে ইফতার ও সাহরির খাবার বিতরণ করছে ‘টিম পজিটিভ বাংলাদেশ’ নামে ফেসবুক ভিত্তিক একটি সংগঠন।

লক্ষাধিক সদস্য নিয়ে ইতোমধ্যে সারাদেশে বেশ সাড়া ফেলেছে মানবিক সংগঠনটি। মানবতার সেবায় নিয়োজিত এ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা গোলাম রাব্বানী। তার আরও কিছু পরিচয় রয়েছে। তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ও ডাকসুর সাবেক সাধারণ সম্পাদক।

নিজেদের অর্থে প্রতিদিন ২০০ মানুষকে ইফতার করাচ্ছে টিম পজিটিভ বাংলাদেশ। রাতভর নিজেরাই রান্না করে অসহায় মানুষের কাছে সাহরির খাবারও পৌঁছে দিচ্ছে তারা।

রোববার (১৮ এপ্রিল) রাতে টিম পজিটিভ বাংলাদেশের সদস্যদের কর্মযজ্ঞের দেখা মেলে রাজধানীর আদাবর-১৬ এর ২ নম্বর রোডে আওয়ামী লীগ নেতা ইয়াছিন মোল্লার সুনিবীড় ভবনে। রাত ১২টায় সংগঠনটির সদস্যরা কেউ প্যাকেটে ভাত ভরছেন, কেউ তরকারি দিচ্ছেন আর কেউবা প্যাকেটের ঢাকনা লাগাচ্ছেন এমন ব্যস্ততা দেখা যায়। এসব কাজের তদারকি করছেন সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা গোলাম রাব্বানী।

এ ভবনের মালিক ইয়াছিন মোল্লা তাদের রান্নার জায়গা দিয়েছেন। সেখানেই প্রতিদিন ২০০ মানুষের জন্য ভাত ও তরকারি রান্না করা হয়। পাশাপাশি একটি রুমও ছেড়ে দিয়েছেন খাবার প্যাকেটিংয়ের জন্য। প্রতিদিন এ বাসায় ৪০ কেজি চালের ভাত, ২০ কেজি গরুর মাংস, সঙ্গে ১০ কেজি আলুর তরকারি রান্না করা হয়। এরপর সংগঠনের সদস্যরা সেগুলো নিজেরাই প্যাকেট করেন। একইভাবে প্রতিদিন ইফতারও তৈরি হয় সেখানে। খাবার তৈরির জন্য বেতনভুক্ত একজন বাবুর্চিও রেখেছেন তারা।

রাত সোয়া ২টায় প্যাকেটিং শেষে সব খাবার গাড়িতে তোলা হয়। এর আগে টিমের নেতা রাব্বানী অন্য সদস্যদের নিয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন সাহরির খাবার দেওয়া হবে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম এলাকায় রাতে ঘুমিয়ে থাকা অসহায় মানুষকে। রাত সাড়ে ৩টার মধ্যে ২০০ মানুষের মাঝে খাবার বিতরণ শেষ করা হয়। এভাবেই প্রতিদিন নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই নিজেদের সকল কাজ শেষ করেন টিম পজেটিভ বাংলাদেশ’র সদস্যরা।

সোমবার (১৯ এপ্রিল) রাতে সাহরির খাবার দেওয়া হয় শ্যামলীতে অবস্থিত শিশু হাসপাতাল এবং শের-ই-বাংলা নগরে অবস্থিত জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (নিটোর) রোগীর স্বজনদের।

 

 

সাহরি বিতরণকালে সংবাদ মাধ্যম কর্মীর সঙ্গে আলাপকালে টিম পজিটিভ বাংলাদেশের অন্যতম সক্রিয় সদস্য জহিরুল ইসলাম জনি জানান, আগে নিজে ভালো ইফতার ও সাহরি খাওয়ার পেছনে ছুটতাম। এখন দেখছি প্রকৃত সুখ অসহায় মানুষকে ভালো কিছু খাওয়াতে পারলে। প্রতিদিন ইফতারি ও সাহরি বিতরণ করে গভীর রাতে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরলেও বুক ভরা তৃপ্তি ক্লান্তি দূর করে দেয়।

গতকাল ২০ এপ্রিল রাতে সাহরির খাবার দেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে রোগী ও তাদের স্বজনদের মাঝে। এর আগে প্রথম ও দ্বিতীয় রোজায় ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর স্বজনদের মাঝে খাবার বিতরণ করা হয়েছিলো।

টিম পজিটিভ বাংলাদেশের আরেক সক্রিয় সদস্য আদাবর থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান রুবেলের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, প্রথম রোজা থেকেই আমরা দিন-রাত কাজ করছি অসহায় রোজাদার মানুষের মুখে ইফতারি ও সাহরির খাবার তুলে দিতে। ভালো কাজে ক্লান্তি থাকে না। প্রতিদিন গভীর রাতে বাড়ি ফিরি। পরিবার থেকে সাপোর্ট পাচ্ছি। ভালো লাগছে মানুষের জন্য কাজ করতে পেরে।

জনি এবং রুবেলের মতো একই রকম তৃপ্তি প্রকাশ করলেন কাউসার আহমেদ রিয়াদ, নায়েম সাইফুল্লাই ভুঁইয়া, মেহেদি হাসান জেবিন ও রিয়াদুল ইসলাম রুবেল। তারাও টিম পজিটিভ বাংলাদেশের সক্রিয় সদস্য।

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত ভাইকে নিয়ে রোজার একদিন আগে পাবনা থেকে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে এসেছেন রিয়াজুল (৪৩) হক। হাসপাতাল এলাকায় খাবারের হোটেল না থাকায় বিপাকে পড়েছেন তিনি।

তিনি বলেন, আগে হাসপাতালের আশপাশে অনেক হোটেল ছিল। এখন সব বন্ধ। আশপাশে কোনো হোটেল নেই। ইফতারের পর সাহরির খাবার এনে রাখলে নষ্ট হয়ে যায়। দুইটা রোজা করেছি রাতে শুধু পানি খেয়ে। রোজাদারদের কথা বিবেচনা করে লকডাউনের মাঝেও কিন্তু কিছু হোটেল খোলা রাখা যায় অথবা হাসপাতাল থেকে রোগীর অন্তত একজন স্বজনকে খাবার দিতে পারে।

হাসপাতাল চত্বরে থাকা কয়েকজন রিয়াজুলের এ দাবির সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, সাহরির খাবার দিতে আর কত টাকা খরচ হবে? সরকার চাইলে এটার ব্যবস্থা করতে পারে।

তারা টিম পজিটিভ বাংলাদেশের সদস্যদের উদ্দেশ্য করে বলেন, এই ভাইয়েরা আজ ভাত ও গরুর মাংস দিয়েছে। আজ কষ্ট ছাড়া সাহরির খাবার খেতে পারব।

সংবাদ মাধ্যম কর্মীর সাথে টিম পজিটিভ বাংলাদেশের মানবিক এ উদ্যোগ নিয়ে কথা হয় সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা গোলাম রাব্বানীর সঙ্গে। তিনি বলেন, প্রথম রোজার দিন থেকে আমরা ইফতার ও সাহরির খাবার বিতরণ করে আসছি। লকডাউনে সবকিছু বন্ধ থাকার কারণে ছিন্নমূল মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। আগে তারা কোনোভাবে খাবারের ব্যবস্থা করতে পারলেও এখন পারছে না। করোনা পরিস্থিতির কারণে খাবারের কষ্টে ভুগছে এসব মানুষ।

তিনি বলেন, প্রতিরাতে সাহরির খাবার নিয়ে বের হচ্ছি। কিন্তু অন্য কোনো সংগঠনকে আমরা রাস্তায় দেখছি না। অথচ দেশে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের অভাব নেই।

গোলাম রাব্বানী বলেন, আমরা আমাদের সাধ্যমতো কিছু মানুষকে ইফতার ও সাহরির খাবার দিচ্ছি। অর্থের জোগানও আমরা নিজেরাই দিচ্ছি। যেমন, কেউ চাল, কেউ মাংস, কেউ আলু, কেউ খাবার রাখার বক্স, কেউ মসলা ও তেল দিয়ে প্রতিদিন সহযোগিতা করছে।

তিনি আরও বলেন, হাসপাতালে রোগীর স্বজনরা সাহরির খাবার পাচ্ছেন না। সব হোটেল বন্ধ। চাইলেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ খাবারের ব্যবস্থা করতে পারে। অন্তত রমজান মাসে এ সহযোগিতা করা উচিত বলে মনে করি।

রাব্বানী বলেন, টিম পজিটিভ বাংলাদেশ ইতোমধ্যে দেশব্যাপী অসংখ্য মানবিক কাজে অংশ নিয়েছে। দেশের যে প্রান্তেই আমরা অসহায় মানুষ পেয়েছি, তার সহায়তায় এগিয়ে গেছি। চিকিৎসা বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি, অসহায় কৃষককে পাওয়ার ট্রলি কিনে দিয়েছি। এমন অসংখ্য ভালো কাজ আছে আমাদের ঝুলিতে। সব মিলিয়ে একটি মানবিক দেশ গড়াই টিম পজিটিভ বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য বলে জানান তিনি।